• মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৭ পূর্বাহ্ন
  • |
  • English Version
  • |
Headline :
ভোলায় সমাজসেবার প্রশিক্ষণে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি ও ঘুস-বাণিজ্যের অভিযোগ ভোলায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ পলিথিন ও কারেন্ট জাল জব্দ ভোলা সদর উপজেলা পিআইও জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে টিআর কাবিটার তথ্য নিয়ে লুকোচুরির অভিযোগ  ভোলা মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ও এশিয়া ডক্টরস পয়েন্টের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা চুক্তি স্বাক্ষর ভোলায় দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র”তাজা গোলা ও গাঁজাসহ ১ কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড ভোলায় গাঁজাসহ ১ মাদক কারবারিকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড ভোলার মনপুরায় ইঞ্জিন বিকল হয়ে নদীতে ভাসতে থাকা বোটসহ ১২ জন যাত্রীকে নিরাপদে উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। সাবেক চেয়ারম্যান কর্তৃক সাংবাদিক অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় ন্যায় বিচার চায় ফরিদুল ইসলাম ভোলায় মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের কমিটি গঠন”সভাপতি রিয়াজ সম্পাদক সোহেল ভোলায় ইজিপিপি’র আওতায় খাল খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন

ভোলায় সমাজসেবার প্রশিক্ষণে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি ও ঘুস-বাণিজ্যের অভিযোগ

Reporter Name / ৯১ Time View
Update : সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

আশিকুর রহমান শান্ত, ভোলা জেলা প্রতিনিধি।

ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির’ আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে ব্যপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন বাস্তবমুখী ট্রেডে দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও, রহস্যজনক কারণে মাত্র ১৫ দিনের একটি ‘কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন’ কোর্সে নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতি প্রশিক্ষণার্থীকে দেওয়া হচ্ছে ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা। আর এই বিপুল অংকের সরকারি ভাতার লোভেই দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর একাংশকে জিম্মি করে একটি প্রভাবশালী দালাল চক্র জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভোলা জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, অনগ্রসর জনগোষ্ঠিসমূহের জীবন মান উন্নয়নে ১৫ দিন ব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। এতে জেলা বিভিন্ন উপজেলার থেকে বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ড্রেস মেকিং, টেইলারিং ও বিউটিফিকেশন, ইলেকট্রিক্যাল, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়া জাত, হেয়ার কাটিং, হস্ত শিল্প, বেসিকডাইভিং, মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ, এসি সার্ভিসিং ট্রেডে মোট ১১৩ জন প্রার্থী আবেদন করেন। এরমেধ্য ৭ জন ইসলাম ধর্মের প্রার্থী ছিলো আর বাকী প্রার্থীরা সবাই হিন্দু ধর্মের প্রার্থী।

প্রশিক্ষণে শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৫ জনকে টিকানোর বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানির পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। 

পরে গত ১১ জুন প্রার্থীদের ভাইভা নেওয়া হয়। এরমধ্যে বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ২৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। পরে গত ১৬ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণকালিন প্রতিদিন নগদ ৫০০ টাকা ভাতা ও প্রশিক্ষণ শেষে ৫০ হাজার টাকা চেক প্রদান করা হয়। ফলে প্রত্যেক প্রশিক্ষনার্থী প্রশিক্ষণ শেষে ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হয়েছে।

তবে অনুসন্ধে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রশিক্ষনার্থীরা সবাই ভোলা সদর উপজেলার নিতাই চন্দ্র দাস ও লালমোহন উপজেলার তপন কুমারের আত্মীয়। এদের মধ্যে আপন ভাই-বোনসহ একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিও রয়েছে। সাধারণ অনগ্রসর জনগোষ্ঠী যাতে এই লোভনীয় ভাতার খোঁজ না পায়, সেজন্য বিজ্ঞপ্তিটি ব্যাপকভাবে প্রচার না করে গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালন রজত শুভ্র সরকার যাতে গোপনে প্রশিক্ষার্থীদের ঘুষ নিতে পারে সেজন্য বিশ্বস্ত দালাল নিয়োগ করেন। ওই দাদাল চক্রটিকে তিনি অর্থ আত্মস্বার্থের পরিকল্পনা শিখিয়ে দেন। এবং কর্মকর্তার পরিকল্পনায় কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ট্রেডে দালাল চাক্রটি শুধু তাদের নিজস্ব লোকজনকে ফর্ম পূরণ করান। ওই ট্রেডে আবেদন কম পড়ায় কোনো রকম প্রতিযোগীতা ছাড়াই ওই দালাল চক্রের আত্মীয়দেরকে অন্তভূক্ত করেন। এরপর প্রশিক্ষণ শেষে পরিকল্পনা মোতাবেক প্রশিক্ষার্থীদের কাছে থেকে সর্বনিন্ম ১০ হাজার টাকা আদায় করে দালাল চক্রের প্রধান নিতাই চন্দ্র দাস ও তার সহযোগী তপন চন্দ্র ও ধীরেন চন্দ্র।

সচেতন মহলের মতে, ১৫ দিনে কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের মতো বিষয়ে দক্ষতা অর্জন অসম্ভব। মূলত সাড়ে ৫৭ হাজার টাকার সরকারি বরাদ্দ দ্রুত পকেটেস্থ করতেই এই ১৫ দিনের ‘প্রহসনমূলক’ প্রশিক্ষণের আয়োজন।

অনুসন্ধানের হাতে আসা এক চাঞ্চল্যকর অডিও কথোপকথনে দেখা যায়, প্রশিক্ষণ শেষ হওয়া মাত্রই উপকারভোগীদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে কমিশন বা ঘুষ দাবি করছে স্থানীয় দালাল চক্র। বরিশাল অবস্থানরত প্রশিক্ষণার্থী রত্না রানীর ওই কথোপকথনে রত্না স্বীকার করেন, তিনি ও তার ভাই তপন দুজনেই এই কম্পিউটার ট্রেনিং করেছেন। তিনি প্রশিক্ষণ ভাতা হিসেবে সর্বমোট ৫৭,৫০০ টাকা বুঝে পেয়েছেন। টাকা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রত্নার স্বামী সজল নেপথ্য থেকে বলেন, “১০ হাজার টাকার কথা বলছে স্যার। এই যে নেতা আছে, তারা সবাই ১০ হাজার টাকা কইরা নিতে আছে। নিতাই (নিতাই) বাবু কইরা একজন আছে, সবার থেইকা ১০ হাজার নেছে। অলক, সজীব ওরা প্রশিক্ষণ করছে, ওরা ১০ হাজার কইরা দেছে।”

রত্না রানীও জানান, তিনি ধীরেন ভাইয়ের (মামা ধীরেন চন্দ্র দাস) মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণে ঢুকেছেন এবং তাকেও ১০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে অন্যান্যদের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন।

দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের লেজপাতা গ্রামের মিঠুন চন্দ্র মন্ডল জানান, সে প্রশিক্ষণ শেষে কত টাকা পেয়েছেন এবং কাকে কত টাকা দিয়েছেন এটি কাউকে বলতে বারন আছে। কে বারন করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমাজ সেবা অফিস ও তার এক আত্মীয় বারন করেছেন।

লালমোহনে সীমা রানী জানান, তার কাছ থেকে তপন চন্দ্র সমাজ সেবা কর্মকর্তাকে দিতে হবে বলে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। তার জানা মতে আরো কয়েকজনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে তপন। তবে সীমা রানীর দাবী তার কাছে থেকে নেওয়ার ১০ হাজার টাকা তিনি তপন চন্দ্রকে প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে উদ্ধার করেছেন।  

ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগের বিষয়ে রবিদাশ ফোরামের সভাপতি ও ভোলা জেলা সমাজ সেবার উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকারের বিশ্বস্ত দাদাল চক্রের প্রধান নিতাই দাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, “আমার সংগঠন থেকে ১৮ জন আবেদন করলেও এর মধ্যে আমার সংগঠনের মাত্র ৬ জন আছেন। তবে প্রশিক্ষার্থীরা সবাই যে তার আত্মীয় স্বজন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। কিন্তু তাদের আমি টিকাই নাই।

অন্যদিকে দালাদ চক্রের আরেক সদস্য লালমোহনের রবিদাশ ফোরামের সাবেক সভাপতি ধীরেন চন্দ্র দাস দাবি করেন, কেবল আবেদন ফরম জমার জন্য অফিশিয়াল ফি বাবদ ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিতরা তার আত্মীয় স্বজন কিন্তু তারা যোগ্যতাবলে এসেছে।  

এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণার্থীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রচারের জন্য উপজেলা, শহর কার্যালয় ও ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই ২৫ জনকে নেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রত্যেকের কাছ থেকে নিতাই, ধীরেন ও তপুন চন্দ্রর মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অস্বীকার করেন বলেন, আমার অফিসের বাহিরে কেউ যদি কিছু করেন সেটার দায়ভার আমার নয়।

এছাড়াও ২৫ জনই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক কেনো এমন প্রশ্নের জাবাবে তিনি দাবী করেন ইসলাম ধর্মের ৭ জন আবেদন করেছেন তারা কেউ টিকেনি।

ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান জানান, ওই প্রশিক্ষণ কমিটির তিনি সভাপতি ছিলেন। স্বচ্ছতার বিষয়ে আমি সমাজ সেবা কর্মকর্তাকে একাধিকবার জিজ্ঞাস করছি তিনি সব ঠিক আছে বলে আমাকে জানিয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে সাংবাদিকের মাধ্যমে জানতে পেরেছি সমাজ সেবা উপ-পরিচালকের অনিয়মের বিষয়টি। সেটি আমরা তদন্ত করে ব্যবস্তা গ্রহণ করবো।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category